Published : 25 Feb 2026, 07:09 AM
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায়, ভাউকসার গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে একশো বছরেরও বেশি পুরনো এক মসজিদ। তিনটি গম্বুজের এই মসজিদটি স্থাপত্যকলার এক অসাধারণ উদাহরণ। চুন ও সুরকির নিখুঁত গাঁথুনি, দেয়ালের দৃঢ়তা এবং মোগল স্থাপত্যের ছোঁয়া মসজিদটিকে করেছে অনন্য। এটি শুধু এলাকার ঐতিহ্য নয়, স্থাপত্যিক সৌন্দর্য্যেরও এক অমূল্য রত্ন, যা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে আকর্ষণ করে। নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর স্বামী সৈয়দ মুহাম্মদ গাজী চৌধুরী এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তিনি ছিলেন একজন ধনী জমিদার। ১৯০২ সালে নিজ বাড়ির সামনে তিনি এই মসজিদটি তৈরি করেন, যার নাম ‘ভাউকসার তিন গম্বুজ পুরাতন জামে মসজিদ’। দরজার উপরে লেখা রয়েছে, ‘স্বর্গধামে বিরাতি చెందిన এই মসজিদের নির্মাতা অদ্বিতীয় দানশীল মুহাম্মদ গাজী চৌধুরী। সন-১৩০৯ বাং, ১৯০২ ইং।’ কুমিল্লা শহর থেকে বরুড়ার ভাউকসার গ্রাম প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। বিজরা-ভাউকসার সড়ক ধরে গেলেই চোখে পড়বে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই সুন্দর মসজিদ। একটি সুন্দর ফটক পেরিয়ে প্রবেশ করতে হয় মূল মসজিদে। তিনটি গম্বুজের পাশাপাশি এখানে তিনটি মিনারও রয়েছে।
পাঁচটি কাঠের দরজা এবং ভেতরে সুন্দর কারুকার্যখচিত দেয়াল ও অলংকরণ মুগ্ধ করে তোলে। চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি মসজিদের দিকে তাকালে বিভিন্ন ফুলের নকশা যে কারোর মন জয় করে নেয়। ভাউকসার গ্রামের মো. আবদুস সাত্তার ২৫ বছর ধরে এই মসজিদে ইমামতি করেছেন। গত বছর রোজায় তিনি ইমামতি জীবন থেকে অবসর নেন। তিনি বলেন, ‘এই মসজিদ আমাদের এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী। আমি ২৫ বছর ধরে এখানে ইমামতি করেছি। যদিও এক বছর আগে অবসর নিয়েছি, এখনও বেশিরভাগ নামাজ এখানেই আদায় করি।’ আবদুস সাত্তার জানান, জমিদার সৈয়দ মুহাম্মদ গাজী চৌধুরী মসজিদটি নির্মাণ করেন। তবে এর পাশেই তার বাবা এনায়েত গাজী চৌধুরীর তৈরি আরেকটি মসজিদ রয়েছে, যা এই মসজিদের চেয়ে প্রায় অর্ধশত বছর আগে নির্মিত হয়েছিল। পুরোনো সেই মসজিদের অবকাঠামো এখন আর নেই, সংস্কার করে নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। মজার বিষয় হলো, দুটি মসজিদই একটি পুকুরের দুই পাড়ে অবস্থিত। পূর্ব পাড়ে এনায়েত গাজী চৌধুরীর মসজিদ এবং পশ্চিম পাড়ে গাজী চৌধুরীর মসজিদ। স্থানীয় কমিটি এটি পরিচালনা করে।
জমিদার পরিবারের কেউ এখন আর এলাকায় থাকেন না। আবদুস সাত্তার বলেন, প্রতিদিন বহু মানুষ মসজিদটি দেখতে আসেন। তিনি আরও জানান, ‘এটি মোগল আমলের মসজিদগুলোর মতোই স্থাপত্যকলার এক দারুণ নিদর্শন। লোকমুখে শোনা যায়, জমিদার মুহাম্মদ গাজী চৌধুরী কলকাতা থেকে মসজিদের ডিজাইন পছন্দ করেছিলেন এবং বিক্রমপুর থেকে শ্রমিক আনা হয়েছিল।’ বর্তমান ইমাম হাফেজ মো. মাসুদ রানা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে আমি যেভাবে মসজিদের ভবন দেখেছি, এখনও সেভাবেই আছে। সামান্য কিছু সংস্কার করা হয়েছে, তবে ১২৪ বছর পরও মসজিদটির কাঠামোতে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রতিদিন অনেকে মসজিদটি দেখতে আসেন, বিশেষ করে শুক্রবারে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে নামাজ পড়তে আসেন। আমরা চেষ্টা করি মসজিদের সৌন্দর্য যেন অক্ষুণ্ণ থাকে।’ স্থানীয় বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব মো. আবদুল লতিফ বলেন, মসজিদের কারণে এলাকার অন্যরকম পরিচিতি আছে। বহু মানুষ পুরোনো মসজিদটি দেখতে আসেন, কেউ ছবি তোলেন, আবার কেউ ভিডিও করেন। কুমিল্লার ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবীর বলেন, শত বছরের পুরোনো এই মসজিদটি ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে আজও গৌরবের সঙ্গে টিকে আছে। মোগল আমলের মসজিদগুলোর সঙ্গে এই মসজিদের স্থাপত্যশৈলীর অনেক মিল পাওয়া যায়।।