Published : 13 Feb 2026, 09:07 AM
বাংলাদেশের গ্রামবাংলায় শিক্ষা আর সংস্কৃতির সুযোগের অভাব নতুন কিছু নয়। তবে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সোয়ালিয়া গ্রামে যে পাবলিক লাইব্রেরি গড়ে উঠেছে, তা যেন এক নতুন সামাজিক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে। প্রথম আলোর খবরে দেখা যায়, অজপাড়াগাঁয়ের একটি সাধারণ ভবন কীভাবে বৃহত্তর অঞ্চলের মানুষের জীবনে আলো নিয়ে আসতে পারে। দিনমজুর অধ্যুষিত ছয়টি গ্রামের মাঝে এই লাইব্রেরিটি শিশুদের জন্য খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। এখানে শুধু বই পড়া হয় না, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, শীতবস্ত্রের সাহায্য, বৃক্ষরোপণ, দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ, রচনা, শব্দার্থ, টাইপিং এবং বই পড়ার মতো নানা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। লাইব্রেরিটি জ্ঞানচর্চাকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছে। এই উদ্যোগের স্বপ্নদ্রষ্টা গ্রামের সন্তান আবু সাঈদ। ইউরোপে উচ্চশিক্ষা লাভের সময় তিনি যে পরিকল্পনা করেছিলেন, দেশে ফিরে নিজস্ব সম্পদ ও পরিচিতি ব্যবহার করে তা বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত আয়ের একটি অংশ ব্যয় করে এবং দেশ-বিদেশের শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাহায্য নিয়ে তিনি যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, তা আমাদের উন্নয়ন চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। এটি প্রমাণ করে, উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো তৈরি নয়, মানুষের শক্তিতে বিনিয়োগই দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের মূল ভিত্তি। লাইব্রেরিতে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ বই রয়েছে। তবে বইয়ের সংখ্যাটা বড় বিষয় নয়, বরং বই পড়ার সংস্কৃতি তৈরি হওয়াটাই আসল। শিক্ষার্থীরা এখানে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, প্রবন্ধ ও সাধারণ জ্ঞানের বই পড়ছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্বগুণ ও যোগাযোগের দক্ষতা অর্জন করছে। এটি গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থার একটি দারুণ সহায়ক মডেল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই লাইব্রেরি শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া রোধ করছে, দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখাচ্ছে এবং তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে।
যশোর মেডিকেল কলেজ থেকে সদ্য পাশ করা এক ডাক্তারের সাফল্যের পেছনে এই লাইব্রেরির অবদান তার প্রমাণ। একটি লাইব্রেরি মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে – সোয়ালিয়া পাবলিক লাইব্রেরি সেই কথাটি প্রমাণ করে দিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনায় গ্রামের লাইব্রেরিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় উদ্যোগগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া, বই ও প্রযুক্তির সরবরাহ বাড়ানো, প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি করা এবং এই মডেলকে অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অজপাড়াগাঁয়ে একটি ছোট লাইব্রেরি যদি সামাজিক পরিবর্তনের অনুঘটক হতে পারে, তবে পরিকল্পিত সহায়তার মাধ্যমে এর প্রভাব আরও অনেকগুণ বাড়ানো সম্ভব। সোয়ালিয়া পাবলিক লাইব্রেরি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি লাইব্রেরি শুধু কয়েকটি বইয়ের ঘর নয়, এটি ভবিষ্যৎ গড়ার কারখানা। গ্রামবাংলার উন্নয়নে এই ধরনের উদ্যোগই নীরব বিপ্লবের সূচনা করতে পারে।।