Published : 12 Feb 2026, 09:08 AM
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম যেন বাংলাদেশে একটি অচলাবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ‘দুর্নীতি ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৫’-এ ১৮২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। অর্থাৎ, বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর সারিতে বাংলাদেশ আবারও নিজের স্থান ধরে রেখেছে। ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৪ স্কোর, যেখানে বৈশ্বিক গড় ৪২। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত অসুস্থতার দর্পণ। গত বছরের তুলনায় সামান্য ১ পয়েন্টের উন্নতি হলেও সামগ্রিক র্যাঙ্কিংয়ে আমরা একধাপ পিছিয়ে গেছি। এই চিত্র স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, সামান্য অগ্রগতি দিয়ে কাঠামোগত দুর্নীতিকে চাপা দেওয়া যায় না। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান যথার্থই বলেছেন, সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলনের ইতিবাচক প্রভাবের কারণে এই সামান্য উন্নতি হয়েছে। কিন্তু সংস্কার প্রক্রিয়ার দুর্বলতা এবং মাঠপর্যায়ের ব্যাপক দুর্নীতি সেই সম্ভাবনাকে ম্লান করে দিয়েছে। অর্থাৎ, পরিবর্তনের সুযোগ এসেছিল, কিন্তু আমরা তা কাজে লাগাতে পারিনি।
প্রশ্ন হলো, কেন বারবার আমরা এই সুযোগ হারাচ্ছি? দুর্নীতি এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। সরকারি পরিষেবা পেতে ঘুষ, টেন্ডারে কমিশন, নিয়োগে অনিয়ম, ব্যাংকিং খাতে ঋণ কেলেঙ্কারি—সব মিলিয়ে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই সংস্কৃতিতে জবাবদিহিতার পরিবর্তে প্রভাব বিস্তার, দক্ষতার বদলে দলীয় আনুগত্য এবং আইনের শাসনের পরিবর্তে আপস করার মানসিকতা প্রধান হয়ে উঠেছে। ফলে, যতই নীতি ও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হোক না কেন, মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। বিশ্ব এবং আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে আমাদের অবস্থান আরও হতাশাজনক। ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো যেখানে ৮০-এর বেশি স্কোর নিয়ে স্বচ্ছতার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, সেখানে দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটানও ৭১ স্কোর করেছে। ভারত, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা—এমন অনেক দেশই বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এমনকি দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকা দেশগুলোও আমাদের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। প্রশ্ন জাগে, আমরা কোথায় পিছিয়ে আছি? উত্তরটি স্পষ্ট—রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠানের অভাব। দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তদন্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকে এবং বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় ভোগে, তাহলে দুর্নীতিবাজরা উৎসাহিত হয়, আর সৎ মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে।
অন্তর্বর্তী সরকারও স্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে—এই স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের স্বাধীন ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনা অত্যাবশ্যক। দুর্নীতি কেবল আইন দিয়ে নয়, সামাজিকভাবেও প্রতিরোধ করতে হবে। দুর্নীতি কোনো নিয়তি নয়, এটি রাজনৈতিক ও নৈতিক সিদ্ধান্তের ফল। সেই সিদ্ধান্ত বদলানোর সাহসই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই পারে দুর্নীতির এই দুষ্টচক্র থেকে দেশকে মুক্তি দিতে।।