Published : 06 Feb 2026, 09:06 AM
দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকেরা। যখন তাঁরা পাঠদানের পরিবর্তে ভোটার তালিকা তৈরি, জরিপ কাজ, তথ্য সংগ্রহ কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রথম আলোর খবরে জানা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তাঁদের নিয়মিত পাঠদানের বাইরেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে প্রায় সাঁইত্রিশ ধরনের অবাঞ্ছিত কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় এই তথ্য উঠে এসেছে। সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রায় সাতাশ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষক এই ধরনের পেশাবহির্ভূত কাজে জড়িত। গড়ে একজন শিক্ষক প্রতি মাসে প্রায় ২৪ ঘণ্টা এমন কাজে ব্যয় করেন, যা সরাসরি শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এই সময়টা যদি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদান, প্রস্তুতি, মূল্যায়ন অথবা দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাসে ব্যয় করা হতো, তাহলে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন অবশ্যই সম্ভব হতো। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের উপর পড়ছে।
অধিকাংশ শিক্ষকই মনে করেন, শিক্ষার্থীরা মূল বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝতে পারছে না এবং পরীক্ষার ফলাফলে এর কুপ্রভাব পড়ছে। আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা ক্লাস (রেমিডিয়াল ক্লাস) খুবই জরুরি। কিন্তু পঁচিশ শতাংশ শিক্ষক জানিয়েছেন, কাজের চাপে তাঁরা এই অতিরিক্ত সহায়তা দিতে পারছেন না। এই পরিস্থিতি কেবল শিক্ষার মানের প্রশ্ন নয়, এটি শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘ সময় ধরে অপ্রাসঙ্গিক কাজে যুক্ত থাকলে হতাশা, ক্লান্তি এবং কাজে আগ্রহ কমে যেতে পারে। একজন সহকারী শিক্ষক প্রতি মাসে যে সময় পেশাবহির্ভূত কাজে দেন, তার আর্থিক মূল্য প্রায় চার হাজার টাকার সমান। তবে এই ক্ষতির পরিমাণ শুধু টাকায় সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে এক কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। সমীক্ষায় দেওয়া পাঁচটি সুপারিশ নতুন কিছু নয়, বরং দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া কিছু জরুরি দাবি।
শিক্ষকদের উপর তথ্য সংগ্রহ বা প্রশাসনিক কাজের বোঝা চাপানো বন্ধ করা, প্রতিটি বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী নিয়োগ দেওয়া, একটি সমন্বিত ডিজিটাল পোর্টাল চালু করা, শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা এবং পাঠদানের সময় তাঁদের সুরক্ষার জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করা—এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নযোগ্য এবং প্রয়োজনীয়। প্রাথমিক শিক্ষা কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্র নয়। এখানেই ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মিত হয়। যদি শিক্ষকেরা শিক্ষাদানের সম্পূর্ণ সুযোগ না পান, তাহলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। আমরা আশা করি, কর্তৃপক্ষ এই সমীক্ষায় উঠে আসা বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষকের সময় বাঁচানো মানে শিক্ষার একটি টেকসই ভবিষ্যৎ তৈরি করা।।