Published : 20 Jan 2026, 09:07 AM
রাজশাহীর গোদাগাড়ীর বাবুডাইং গ্রামে কোল সম্প্রদায়ের পাঁচটি পরিবারের বসতভিটা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা উন্নয়নের চাকায় পিষ্ট হওয়া এক বেদনাহত বাস্তবতাকে আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে তারা যে জমিতে বসবাস করছিল, তা থেকে উচ্ছেদ হয়ে তারা আজ নিজভূমেও বাস্তুহারা। আদালতের নির্দেশের দোহাই পেলেও প্রশ্ন জাগে, বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে কেন এই অসহায় মানুষদের খোলা আকাশের নিচে ঠেলে দেওয়া হলো? উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অসহায় উক্তি—‘কী করার আছে’—রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতার প্রতি চরম প্রশ্নবোধক। গোদাগাড়ীর এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এটি সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও ভূমিহীনতার করুণ প্রতিচ্ছবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ভূমিহীন। পটুয়াখালী ও বরগুনার রাখাইনপল্লি থেকে শুরু করে মধুপুরের গারো জনপদ— সর্বত্রই চলছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে জমি থেকে উচ্ছেদ ও দখলের পালা। ১৯৩০-এর দশকে উপকূলীয় অঞ্চলে যেখানে ২৩৭টি রাখাইন গ্রাম ছিল, আজ তা বিলুপ্তির পথে।
জাল দলিল, হুমকি-ধমকি ও আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এই প্রান্তিক মানুষদের পৈতৃক জমি থেকে বিতাড়িত করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় tragedy হলো, সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমি সুরক্ষার জন্য ‘বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন’-এর ৯৭ ধারা থাকা সত্ত্বেও তার প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। রাজস্ব কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া জমি হস্তান্তরের নিয়ম থাকলেও প্রভাবশালীরা তা অবজ্ঞা করছেন। মধুপুর শালবনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করা গারোরা আজ বন বিনাশের মামলার ভয়ে উচ্ছেদের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। অথচ সেই বনের জমি দখল করে বাঙালিদের বাণিজ্যিক বাগান তৈরিতে প্রশাসনের নীরবতা রহস্যজনক। রাখাইন অধিকারকর্মী মেইনথিন প্রমীলা ক্ষোভের সাথে বলেছেন, ‘সরকার বদলালেও দখলদার বদলায় না, দখলদারি চলতেই থাকে।’ এই নির্মম বাস্তবতা আজ সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিয়তি।
শ্মশানের জমিও আজ সুরক্ষিত নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে এই জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়ছে, কারণ তারা তাদের অস্তিত্বের ভিত্তি—ভূমি হারাচ্ছে। আমরা মনে করি, শুধু শোক প্রকাশ করে বা টিন বিতরণ করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার সুরক্ষায় অবিলম্বে একটি ‘পৃথক ভূমি কমিশন’ গঠন করা উচিত। একই সাথে, সরকারি খাস জমি বণ্টনের ক্ষেত্রে এই প্রান্তিক ও ভূমিহীন মানুষদের অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া শুধু আদালতের নির্দেশের আক্ষরিক প্রয়োগ নয়, বরং তাদের জীবন ও জীবিকার নিশ্চয়তা প্রদান করাও রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব।।