Published : 16 Aug 2026, 09:17 AM
জীবনের শেষ প্রহরে এসে অমল এক গভীর শূন্যতার মুখোমুখি। মেদিনীপুর সদর হাসপাতালের এক কোণে নিথর হয়ে শুয়ে আছে এই মানুষটি, যার জীবন ছিল অভাব আর একাকীত্বের দীর্ঘ পথচলা। অবশ্য এই কষ্টের অভিজ্ঞতা তার প্রথম নয়; আগেও বহুবার তাকে এই কঠিন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে হয়েছে। এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মনে হচ্ছে যেন সে জীবনের সমস্ত যাত্রার শেষ গন্তব্যে পৌঁছে গেছে—পরিবার-আত্মীয়দের চোখে সেই বিষাদের ছাপ স্পষ্ট। হাসপাতালের বারান্দায় দিন দিন মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে, যারা হয়তো অমলকে দেখতে আসে। অথচ এই মানুষটি দিনের পর দিন নীরবে তাদের সামনে দিয়ে হেঁটে চলেছে। প্রেম বা ভালোবাসার কথা মুখে আনতে গেলেও তা ঘরের কোণে চাপা থাকে। কিন্তু দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা আর দীনতার অনুভূতিগুলো তো সবার কানেই পৌঁছে যায়। সে জানত, তার সংসারের পথ শুকিয়ে যাওয়া গড়াই নদের মতো বিবর্ণ। মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনা হলো, দুঃখের ভার কোনো বাঁধনে বেঁধে চিৎকার করে বলার মতো সঙ্গী খুঁজে না পাওয়া।
জীবনের প্রতিটি বাঁকে সঙ্গীর প্রয়োজন না থাকলেও, এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে কারও একার আশ্রয় পাওয়াটা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। অমলের কাছে 'সঙ্গী' আর 'সহচর' সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ধারণা। সে কখনো অন্যের দয়ার ওপর নির্ভর করেনি; নিজের সম্মান ও আত্মমর্যাদা বজায় রেখে চলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেই লড়াই তাকে ক্রমশ ক্লান্ত করে দিয়েছিল। সন্তানদের অসহায়তা দেখে তার মনোবল ভেঙে গিয়েছিল। সে চেয়েছিল, অন্তত কেউ পাশে এসে বসুক, চায়ের কাপে ঝড় না উঠলেও সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ হোক। কেউ যেন জিজ্ঞেস করে, 'কেমন আছিস?' এই সামান্য খোঁজটুকুও অমলের কাছে ছিল এক বিশাল প্রাপ্তি। চিকিৎসার প্রয়োজনে তার শরীরে স্যালাইনের মাত্রা বাড়তে থাকে, এবং ধীরে ধীরে খাদ্যের প্রয়োজনও থেমে যায়। এই মোটা শরীরটি এখন কেবল স্যালাইনের ওপর নির্ভরশীল। বুঝল, হাতে আর সময় নেই। ঠিক সেই সময়েই এক এমন মানুষ হাসপাতালে আসেন, যে একসময় অমলের ভিটেমাটি হারানোর সব বন্দোবস্ত করেছিল।
কত দিন আদালতের বারান্দায় ঘুরেছে অমল নিজের জমি রক্ষার জন্য! এবার সেই মানুষটি এসে তার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইতে এসেছেন। এই অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ অমলের মনে অভিমান ও ঘৃণার এক নতুন সুর সৃষ্টি করে। বিখ্যাত সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অন্নের অভাবে জীবনাবসান ঘটিয়েছিলেন, চিকিৎসা ছাড়াই। তাঁর কফিনে ফুলের স্তূপ দেখে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন—'ফুলগুলো সরিয়ে নাও, আমার লাগছে। মালা জমে জমে পাহাড় হয়; ফুল জমতে জমতে পাথর। পাথরটা সরিয়ে নাও, আমার লাগছে।' অমলের কাছেও এই অনুভূতি তীব্র—স্মৃতির গভীরে নিজেকে চিনতে পারার চেষ্টা করেও সে নিজেকে এক অভাগী মনে করে। সে প্রার্থনা করে না আর, শুধু চেয়ে থাকে—একমুঠো মাটি দিস মুখে, শিগগিরই জমাব ওপারে পাড়ি। মানুষের মনের অসুস্থতা সত্যিই অদ্ভুত! আমরা নিজের ভালো থাকার চেষ্টা করি, অন্যের সুখের জন্য বাঁচি, অন্তত জিজ্ঞেস করি, 'কেমন আছিস?' এই মানবিক সংযোগই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।।
মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার তিন বিমান চালক জীবিত, কাতার বন্দী: ইরানের দাবি