Published : 02 Feb 2026, 11:08 AM
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই নেমে এলো একরাশ বিষাদ। কিছুদিন আগেই ফুটবল-ভলিবলের জাদুকর মোস্তফা কামালের বিদায়, তার শোক কাটতে না কাটতেই সিলেটের মাটি কেঁপে উঠলো আরও এক দুঃসংবাদে। ৯৩ বছর বয়সে চিরতরে চোখ বুজলেন কিংবদন্তী গোলকিপার রণজিৎ দাস। সিলেটের পাহাড়ের কোলে তাঁর প্রিয় ‘কমলাকান্ত ভবন’ আজ শূন্য। যদিও শেষ নিঃশ্বাস তিনি সিলেটের হাসপাতালে ত্যাগ করেন। একটি যুগের অবসান হলো। পঞ্চাশের দশকে ঢাকার ফুটবল-হকি ময়দানে যিনি ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র, গত কয়েক বছর ধরে তিনি ছিলেন নীরব। স্মৃতি বিভ্রমের কারণে কথা বলতে পারতেন না। সিলেটের করের পাড়ায় তাঁর বাড়িটি সবসময় মানুষের আনাগোনায় মুখরিত থাকত, কিন্তু গত কয়েক বছর তিনি নীরবে কাটিয়েছেন। মাঠের রণজিৎ দাস ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৫৫ সালে ইস্পাহানি ক্লাবের মাধ্যমে ফুটবল যাত্রা শুরু করেন, এরপর আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের সোনালী দিনগুলো তাঁর কাছে অবিস্মরণীয়। ১৯৫৮ সালে তাঁর নেতৃত্বেই আজাদ স্পোর্টিং লিগ শিরোপা জেতে।
মোহামেডানের সাদা-কালো জার্সিতেও তিনি মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন। ১৯৫৭ সালে কলকাতা মোহামেডানের হয়ে অল ইন্ডিয়া ডুরান্ড কাপে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর খেলার তালিকা বিশাল। খেলা ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হন এবং আজাদ স্পোর্টিং ফুটবল দলকে বেশ কয়েক বছর প্রশিক্ষণ দেন। আজ ক্রীড়াঙ্গন যখন একের পর এক তারকা হারাচ্ছে, রণজিৎ দাসের প্রয়াণ সেই শূন্যতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৯৩২ সালের ২৯ অক্টোবর তাঁর জন্ম। তিনি ছিলেন বহু প্রতিভার অধিকারী ক্রীড়াবিদ। ফুটবল থেকে শুরু করে হকি—সব খেলাতেই ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। পূর্ব পাকিস্তান ফুটবল দলের গোলপোস্ট তিনি দক্ষতার সঙ্গে রক্ষা করেছেন। তরুণ বয়সে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান হকি দলের অধিনায়ক। ষাটের দশকে তিনি দাপিয়ে হকি খেলেছেন। তবে তাঁর মনে ছিল এক গোপন কষ্ট।
উচ্চতা কম হওয়ার কারণে তিনি পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে সুযোগ পাননি। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘উচ্চতা কম ছিল বলেই হয়তো হলো না।’ এই আক্ষেপ ২০০৬ সালে প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পাওয়ার মাধ্যমে কিছুটা হলেও দূর হয়। সম্মাননা পাওয়ার পরও তিনি প্রায়ই সিলেট থেকে ঢাকায় এসে অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন এবং তাঁর চোখেমুখে ফুটে উঠত তৃপ্তির হাসি। প্রথম আলোর স্বীকৃতি পাওয়ার পরের বছর তিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পান, যা তিনি আরও আগে পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। শেষ জীবনে তাঁর স্ত্রী রেখা দাসই ছিলেন একমাত্র অবলম্বন। যে মানুষটি একসময় মাঠের সব গল্প অনর্গল বলে যেতেন, নিজেকে বলতেন ‘টেলিগ্রাম যুগের মানুষ’, তিনি শেষ সময়ে এসে নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে কিংবদন্তী জাকারিয়া পিন্টু চলে গেছেন, তার আগে জহিরুল হক, আর আজ রণজিৎ দাস। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের বটবৃক্ষগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছেন। সিলেটের পাহাড়ের ঢালে এখন আর কেউ ফুটবল-হকির গল্প শোনার জন্য অপেক্ষা করবে না। রণজিৎ দাস নেই, কিন্তু তাঁর বীরত্বগাথা এদেশের ফুটবলের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বললেন, “কোলম্যানকে নিয়ে আমি আশাবাদী”—প্রথম আলো