Published : 06 Jul 2026, 01:39 PM
হিজরি সনের একটি নতুন অধ্যায় আমাদের সামনে এসেছে। এই নতুন বছরের সূচনা হয় এমন এক মাসের মাধ্যমে, যাকে নবী মুহাম্মদ (সা.) ‘আল্লাহর মাস’ আখ্যা দিয়েছেন। তাই মহররম কেবল একটি মাস নয়; এটি সম্মান, বরকত, অনুতাপ এবং নেক আমলের এক বিশেষ সময়কাল। মহররম কী এবং এর গুরুত্ব ‘মহররম’ শব্দের অর্থ হলো নিষিদ্ধ, পবিত্র, সম্মানিত বা যার মর্যাদা রক্ষা করা অপরিহার্য। হিজরি বারোটি মাসের মধ্যে চারটি মাস আল্লাহ তাআলার কাছে বিশেষভাবে মর্যাদাপূর্ণ, এবং মহররম তাদের অন্যতম। এই কারণে এটিকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ নামে অভিহিত করা হয়। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারোটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। সুতরাং তোমরা নিজেদের প্রতি অবিচার করো না।” (সূরা তাওবা, আয়াত: ৩৬) পবিত্র কোরআনে এই মাসকে বিশেষ মর্যাদা দান করা হয়েছে এবং এই সময়ে নিজেদের ও অন্যদের ওপর জুলুম করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি জাহেলী যুগেও এই মাসে যুদ্ধ ও রক্তপাতের মতো কাজকে হারাম ঘোষণা করা হতো।
কেন এই মাসকে ‘হারাম’ মাস বলা হয়? মহররম মাসের তাৎপর্য অনেক গভীর। ইসলামের ইতিহাসে এই মাসটি বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মৃতি বহন করে। রাসূল (সা.) বলেছেন, “রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩) এই মাসটি সম্পূর্ণভাবে সম্মানিত। অতএব, এই সময়ে যত বেশি নফল রোজা রাখা যায় এবং ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া যায়, ততই সফলতা লাভ করা সম্ভব। আশুরা: মহররমের শ্রেষ্ঠ দিন মহররম মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো ‘ইয়াওমে আশুরা’ বা মহররমের দশ তারিখ। ইসলামপূর্ব আরব সমাজ এবং আহলে কিতাবদের মধ্যেও এই দিনের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পূর্বে মানুষ আশুরার দিন রোজা রাখত এবং কাবায় গিলাফ জড়াত। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, “আমার জানা মতে, নবীজি আশুরার রোজার চেয়ে অন্য কোনো দিনের রোজার ফযীলত লাভের জন্য এত বেশি আগ্রহী ছিলেন না।” তিনি আরও বলেছেন, “আশুরার রোজা বিগত এক বছরের পাপ মোচন করে দেয়।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩২, ১১৬২) মহররম মাসের ৫টি ইবাদত সাহাবীরা এই দিনে শিশুদেরও রোজা রাখতে অভ্যস্ত করতেন।
(সহীহ বুখারি, হাদিস: ১৯৬০; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৬)। মহররম মাসে যা পরিহার করা উচিত আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা এই দিনগুলোতে নিজেদের ওপর জুলুম করো না।” নিজেদের ওপর সবচেয়ে বড় জুলুম হলো আল্লাহর অবাধ্যতা বা পাপ করা। পাপ থেকে দূরে থাকা নিজেই একটি বড় ইবাদত। বর্তমানে আশুরার দিনকে কেন্দ্র করে সমাজে অনেক বিদআত ও কুসংস্কার প্রচলিত আছে, যা সওয়াবের উদ্দেশ্যে করা হলেও ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই। যেমন—বিশেষ নিয়মে গোসল করা, সুগন্ধি লাগানো, মেহেদি ব্যবহার করা, খিচুড়ি রান্না করে উৎসব করা ইত্যাদি। এছাড়াও, আশুরার দিনে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ বলে বুক চাপড়ানো, চিৎকার-চেঁচামেচি করে বিলাপ করা এবং ‘তাজিয়া মিছিল’ বের করা ইসলামি শরিয়তের পরিপন্থী। ইসলামে এভাবে শোক প্রকাশের কোনো বৈধ সুযোগ নেই। এই বিষয়ে ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “এই ধরনের অনুষ্ঠানাদি উদ্যাপন প্রসঙ্গে নবীজি থেকে কোনো বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়নি এবং সাহাবীদের থেকেও কিছু প্রমাণিত নয়। চার ইমামসহ নির্ভরযোগ্য কোনো আলেমও এসব কাজকে সমর্থন করেননি।” (ইবনু তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৫/৩০৮, দারুল ওফা, মানসুরা, মিশর, ২০০৫) ইসমত আরা :শিক্ষক ও প্রবন্ধকার আরও পড়ুন।