Published : 26 Jan 2026, 09:06 AM
কক্সবাজারের চকরিয়া রেলস্টেশনে সম্প্রতি চুরি, ছিনতাইয়ের ঘটনা এবং চলন্ত ট্রেনে পাথর ছোড়ার মতো জঘন্য অপরাধগুলো বাড়ছে। এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় নজরদারির অভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দীর্ঘদিনের সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের ফল। রেলস্টেশনটি এখন যেন আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি প্রশ্নবিদ্ধ। গত দুই মাসে এই স্টেশনে দুই ডজনের বেশি ছিনতাই হয়েছে। যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে টাকা ও মূল্যবান জিনিস কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, অনেকে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। উপরন্তু, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের মতো মারাত্মক ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। অথচ এই স্টেশনটি শুধু একটি উপজেলার নয়, বরং পার্বত্য বান্দরবান থেকে উপকূলীয় মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার মানুষের যাতায়াতের প্রধান প্রবেশদ্বার। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তাহীনতা মানে বৃহত্তর জনজীবনের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।
তাই প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্র কোথায় এবং কারা তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন? চকরিয়া রেলস্টেশন এলাকায় রেলওয়ে পুলিশের কোনো স্থায়ী ক্যাম্প নেই, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীরও কার্যকর উপস্থিতি নেই। যেখানে অধিকাংশ ছিনতাই হয়, সেই অ্যাপ্রোচ সড়কে পর্যাপ্ত আলো নেই, নেই আধুনিক প্রযুক্তির নজরদারি। স্থানীয় প্রশাসন, রেল কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে দায় এড়িয়ে যাওয়ার একটা অসুস্থ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। শুধু ‘চেষ্টা চলছে’ বলে রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেতে পারে না। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এটি সামাজিক চুক্তির লঙ্ঘন। নাগরিকরা রাষ্ট্রকে আনুগত্য জানায় এই প্রত্যাশায় যে রাষ্ট্র তাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সেই মৌলিক প্রত্যাশা পূরণ না হলে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। চকরিয়া রেলস্টেশনের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বিশৃঙ্খলার একটি ছোট, কিন্তু উদ্বেগজনক উদাহরণ।
এই সমস্যার সমাধানে শুধু অতিরিক্ত টহল বা সাময়িক অভিযান যথেষ্ট নয়। অবিলম্বে চকরিয়ার তিনটি রেলস্টেশনে রেলওয়ে পুলিশের স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন, অ্যাপ্রোচ সড়কে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রথম কর্তব্য। একই সাথে, স্থানীয় প্রশাসন, রেল কর্তৃপক্ষ ও থানা পুলিশের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক দায়িত্ব কাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ না থাকে। দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ কমানোর জন্য সামাজিক পুনর্গঠন প্রয়োজন—কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণ সমাজের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। শুধু অপরাধীকে শাস্তি দিলেই হবে না, অপরাধের মূল কারণগুলোও দূর করতে হবে।।