Published : 13 Jan 2026, 09:07 AM
তিস্তা নদী আজ বিপন্ন, আর এর কান্না দেশের উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর ছুঁয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় নদীর ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে, যা কেবল উদ্বেগের বিষয় নয়, বরং এক অশনি সংকেত। উজানের ভারতে একের পর এক বাঁধ নির্মাণের কারণে বাংলাদেশের অংশে তিস্তার পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে— প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ। শুষ্ক মৌসুমে সেচ খরচ বেড়েছে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত, আর বর্ষায় উজান থেকে আসা আকস্মিক ঢলে ভেসে যাচ্ছে ঘরবাড়ি ও ফসল, নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ। শুধু ২০২০ সালেই তিস্তার দুই পাড়ের প্রায় ৯০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে— যা প্রমাণ করে, নদীটি এখন আশীর্বাদের বদলে দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটের প্রতিরূপ। শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ও বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল নেটওয়ার্কের (বাপা-বেন) জাতীয় পরিবেশ সম্মেলনে তিস্তা নিয়ে এই গবেষণাটি উপস্থাপন করা হয়। সেখানে তিস্তা নদী ও এর অববাহিকার জনপদের করুণ দশা প্রকাশ পেয়েছে। তিস্তার উজানে ভারত ৯টি বাঁধ ও ২টি ব্যারেজ তৈরি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, যার মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে বাংলাদেশের ভাটির জনপদকে।
শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে মাত্র ১ হাজার ২০০ কিউসেক পানি আসে, যা চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ। এই পানির অভাবে শুধু কৃষি নয়, নদীর পুরো বাস্তুসংস্থান আজ ধ্বংসের মুখে। গবেষণায় দেখা গেছে, গত কয়েক দশকে তিস্তায় মাছের প্রজাতি ১৪০টি থেকে কমে মাত্র ৩৪টিতে দাঁড়িয়েছে। ৬০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ১২ হাজার হেক্টর হাওর, বাঁওড় ও বিল শুকিয়ে যাওয়ায় একটি অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য আজ ভেঙে পড়েছে। তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, তা সবারই জানা। তবে এই সমস্যা এখন আর শুধু আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন জীবন বাঁচানোর লড়াই। আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী, ভাটির দেশের পানির ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা উজানের দেশের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।
তিস্তা বাঁচলে উত্তরবঙ্গ বাঁচবে— এই সত্যকে সামনে রেখে সরকারকে আরও জোরালো ও কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে, দেশের ভেতরে তিস্তা পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি, পলি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে নদীটিকে পুনরায় সচল করতে হবে। নদীগুলো শুকিয়ে গেলে সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা বিপন্ন হয়ে পড়ে। তাই, তিস্তা রক্ষা করতে এবং নদী-সংলগ্ন লাখ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঠেকাতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রকৃতিকে রক্ষা করেই আমাদের টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে হবে।।