Published : 03 May 2026, 09:07 AM
মাত্র আট বছর বয়সে একটি শিশুর বইয়ের পাতায় মুখ দেওয়ার কথা, অথচ সেই শিশুটি কক্সবাজারের চকরিয়ায় তামাকের পাতা বাঁধার কাজে নিয়োজিত! প্রথম আলোর সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তামাক তোলার মৌসুমে বহু শিশুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছেড়ে পরিবারের উপার্জনে সাহায্য করতে বাধ্য হচ্ছে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে তাদের শিক্ষাজীবন যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনই তাদের ভবিষ্যৎ জনস্বাস্থ্য চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে। আশ্চর্যজনকভাবে, চকরিয়া উপজেলার প্রায় ১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশেপাশে অবাধে তামাক চাষ ও প্রক্রিয়াকরণের কাজ চলছে। অনেক বিদ্যালয়ের দেয়াল ঘেঁষেই তামাক খেত। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, কেবল এই বিদ্যালয়গুলোর আশেপাশে প্রায় ১১০টি তামাক চুল্লি গড়ে উঠেছে। এসব চুল্লি থেকে নির্গত দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত ধোঁয়া সরাসরি শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করছে। কোমলমতি শিশুরা পড়াশোনা করতে এসে প্রতিদিন অদৃশ্য বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যা নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতীক হওয়া উচিত, সেখানে এই বেহাল চিত্র আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দূষিত পরিবেশ শিশুদের জন্য নীরব ঘাতকের মতো। তামাকের সংস্পর্শে শিশুরা ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’-এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক ও রাসায়নিক উপাদান দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের স্নায়ুতন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করছে, যা তাদের স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশে বাধা দেবে। এই আগ্রাসী তামাক চাষ জনস্বাস্থ্যের জন্য শুধু হুমকি নয়, স্থানীয় কৃষি ও পরিবেশও এর জাঁতাকলে পিষ্ট। ক্ষতিকর রাসায়নিকের কারণে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, আর বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে বিষাক্ত পদার্থ মাতামুহুরী নদীর জীববৈচিত্র্যকে বিপন্ন করছে। কৃষকেরা ধান বা অন্যান্য ফসলের বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে এবং তামাক কোম্পানিগুলোর সহজ শর্তে ঋণ ও উপকরণ পাওয়ায় এই সর্বনাশা চাষে বাধ্য হচ্ছেন। সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও তদারকির অভাব।
আইনের তোয়াক্কা না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ গজের মধ্যে এই পরিবেশবিনাশী ও জনস্বাস্থ্যবিরোধী কার্যক্রম বছরের পর বছর ধরে চলছে, যা একটি বড় প্রশ্ন। উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা কার্যালয় শুধু ‘ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বলে দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। বিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকা থেকে অবিলম্বে তামাকখেত ও চুল্লি উচ্ছেদ করে শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে, তামাকের আগ্রাসন ঠেকাতে কৃষকদের জন্য নিরাপদ ও লাভজনক বিকল্প ফসলের ব্যবস্থা করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে কোনোভাবেই তামাকের বিষাক্ত ধোঁয়ায় বলি হতে দেওয়া যায় না। প্রশাসনের কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।।
রামপুরায় মাদ্রাসাছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু: গ্রেপ্তার মূল সন্দেহভাজন