Published : 14 Apr 2026, 05:08 AM
আশা ভোসলে ছিলেন এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব—রেশমি শাড়ি, কপালে বড় টিপ আর ঝলমলে অলংকারে তিনি যেন এক দীপ্তিময়ী প্রতিচ্ছবি। মঞ্চে উঠলেই তিনি হয়ে উঠতেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ২০১৫ সালের কথা। খবর পেলাম, এই কিংবদন্তী শিল্পী বার্লিনে আসছেন। আর দেরি না করে, আমি ঠিক করলাম যে করেই হোক, আমাকে এই অনুষ্ঠানে যেতে হবে। বন্ধুরা টিকিটের ব্যবস্থা করে দিলেন। টিকিট বলতে আসলে ছিল শুধু নাম নথিভুক্ত করা, কিন্তু আগ্রহের মাত্রা ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি। বার্লিনের ‘হাউস ডের কুলটুর ডের ভেল্ট’—বিশ্ব সংস্কৃতি কেন্দ্রে সপ্তাহব্যাপী ‘মাদার ইন্ডিয়া’ নামক এক আয়োজনে প্রধান আকর্ষণ ছিলেন আশা ভোসলে। আমাদের কৈশোরে যে গানগুলো বাজতো—‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া হ্যায়’ কিংবা বাংলা ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’—সেগুলো আমাদের মনে এক অন্যরকম আনন্দ জাগাতো। তাঁর গান শুনে আমরা নিজেদের আধুনিক মনে করতাম, জীবন যেন নতুন এক মাত্রা পেত।
মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সেই মেয়ে, যিনি পরবর্তীতে বিখ্যাত বাঙালি সঙ্গীত পরিচালক রাহুল দেববর্মনকে বিয়ে করেছিলেন—সেই সূত্রে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমাদেরও আপনজন। ২০১৫ সালের ১ আগস্ট। এক ঝলমলে দুপুরের আলোয়, জলের উপর নির্মিত সুন্দর মঞ্চে শুরু হলো তাঁর পরিবেশনা। প্রথমে তিনি গাইলেন ‘উমরাও জান’ চলচ্চিত্রের বিখ্যাত গজল—‘ইন আখোঁ কি মস্তি’, তারপর ‘দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়’। এরপর একে একে তিনি গেয়ে উঠলেন ‘দম মারো দম’, ‘পর্দে মে রেহনে দো’, আবার কখনো উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের রাগভিত্তিক পরিবেশনায় তিনি ছুঁয়ে গেলেন এক ভিন্ন জগৎ। হাজারখানেক দর্শকের মধ্যে মাত্র পঞ্চাশজনের মতো বাঙালি ছিলেন সেখানে। তাঁদের অনুরোধে যখন তিনি গাইলেন ‘না যেও না, রজনী এখনো বাকি’—সেই মুহূর্ত যেন সবকিছু ছাপিয়ে গেল। মনে হলো, দূরদেশে থেকেও হঠাৎ করে সেই কণ্ঠস্বর খুব কাছের হয়ে উঠেছে। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে প্রায় দুই হাজার দর্শককে তিনি মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন। গানের ফাঁকে ফাঁকে তিনি শুনিয়েছেন কিভাবে তিনি একজন শিল্পী হয়ে উঠেছেন, জীবনের নানা গল্প।
মঞ্চে তাঁর সাথে ছিলেন অমিত কুমার—কিংবদন্তী কিশোর কুমারের পুত্র। এছাড়াও তাঁর দৌহিত্র লায়লাও ছিলেন সেখানে। আরও পড়ুনআশা ভোসলে নেই, শুনেই কেঁদে ফেললেন রুনা লায়লা১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বার্লিনের ‘টাগেস স্পিগেল’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, ‘৮২ বছর বয়সী বলিউড কিংবদন্তী আশা ভোসলে বার্লিনে এক অসাধারণ কনসার্টে গান পরিবেশন করেন। জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এমন এক মুহূর্ত আসে, যখন কোনো গান বা কণ্ঠ শুনে মনে হয়—এ যেন প্রেম। আর আশা ভোসলের কণ্ঠে প্রেম অনুভব না করা কঠিন।’ সত্যিই, উপমহাদেশের এই কিংবদন্তীকে কাছ থেকে দেখা ছিল জীবনের এক বিরল অভিজ্ঞতা। সেই সন্ধ্যার আলো, সেই কণ্ঠের মায়া—সবকিছু আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল। তাঁর প্রয়াণের পর বারবার ফিরে আসে সেই রাতের কথা। মনে হয়, ওপারে কোথাও হয়তো এখনো গাইছেন তিনি—চিরন্তন, কালজয়ী আশাজি।।
ইরানের দক্ষিণে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আঘাত: যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, তেহরানের অভিযোগ