Published : 07 Jun 2026, 05:14 AM
মানুষ স্বভাবতই এমনভাবে জীবন অতিবাহিত করে যেন সে অমর। ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা, সম্পদের হিসাব রাখা, আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা—এই ব্যস্ততার মাঝে সে এক অনিবার্য সত্যকে উপেক্ষা করে; আর তা হলো জীবনের শেষ পরিণতি, অর্থাৎ মৃত্যু। মৃত্যু কোনো নিছক গল্প বা দূরবর্তী কল্পনা নয়। এটি এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি যা আমাদের প্রতিটি মুহূর্তকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই প্রতিটি ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির জন্য অপরিহার্য যে তারা প্রতিনিয়ত মৃত্যুকে স্মরণ করবে। কারণ, মৃত্যুর এই জ্ঞান কেবল পরকালের প্রস্তুতিই নয়, বরং পার্থিব জীবনকেও সুন্দর, সুশৃঙ্খল এবং গভীর অর্থপূর্ণ করে তোলে। ১. পাপের হাত থেকে মুক্তি মানুষ প্রায়শই জাগতিক মোহ ও প্রলোভনে পড়ে পাপের পথে চলে যায়। কিন্তু যখন মনে আসে যে আজকের দিনটিই জীবনের শেষ দিন, তখন পাপের আকর্ষণ দুর্বল হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, “প্রত্যেক প্রাণকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫)। এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জাগতিক ভোগ-বিলাসের ক্ষণস্থায়ী, আর চূড়ান্ত পুরস্কার চিরস্থায়ী। মৃত্যুচিন্তা মানুষকে এই ক্ষণস্থায়ী মোহ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। ২. জাগতিক আসক্তি থেকে মুক্তি অধিকাংশ মানুষের দুশ্চিন্তা কেন্দ্রীভূত হয় সম্পদ, পদমর্যাদা এবং সম্মানের পেছনে।
কিন্তু মৃত্যুর কথা ভাবলে মানুষ উপলব্ধি করে যে, আজ যা নিজের বলে মনে হচ্ছে, কাল তা অন্যের হাতে চলে যাবে এবং তার শেষ ঠিকানা হবে একাকী কবর। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা পার্থিব ভোগ-বিলাস বিনষ্টকারী এবং মৃত্যুকে অধিক স্মরণ কর।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩০৭)। মৃত্যু স্মরণ মানুষকে জাগতিক প্রতি অতি-আসক্তি থেকে মুক্ত করে এবং তাকে পরকালের দিকে মনোনিবেশ করতে উৎসাহিত করে। ৩. সময়ের সঠিক মূল্য উপলব্ধি জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়। অর্থ বা সম্পদ হারানো গেলেও তা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, কিন্তু জীবনের একটি মুহূর্ত চলে গেলে তা আর ফিরে আসে না। মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে এই গভীর সত্যটি উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। তাবেয়ী হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, “হে আদম সন্তান, তুমি তো কয়েকটি দিনের সমষ্টি। একটি দিন চলে গেলে তোমার জীবনের একটি অংশও চলে যায়।” (হিলয়াতুল আওলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া: ২/১৪৮)। যে ব্যক্তি সর্বদা মৃত্যুকে স্মরণ করে, সে সময়কে অপচয় করে না; বরং প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে ব্যয় করার চেষ্টা করে। ৪. অহংকার পরিহার অহংকার মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাধিগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি মানুষকে সত্য থেকে দূরে রাখে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়।
নবীজি (সা.) বলেছেন, “যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১)। মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে তার প্রকৃত অবস্থান স্মরণ করিয়ে দেয়। যে ব্যক্তি আজ সম্পদ, ক্ষমতা বা মর্যাদার জন্য গর্ব করছে, একদিন তাকেও মাটির নিচে ফিরে যেতে হবে। এই বাস্তবতা হৃদয়ের অহংকারকে বিনয়ী করে তোলে। ৫. পরকালের প্রস্তুতির দিকে চালিত করা মৃত্যুকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে দেয়। মানুষ বুঝতে পারে যে, এই দুনিয়া চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং এটি পরকালের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার একটি ক্ষেত্র মাত্র। নবীজি (সা.) বলেছেন, “বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের আত্মার হিসাব নেয় এবং পরকালের জন্য আমল করে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৯)। এর অর্থ হলো, প্রকৃত মুমিনের কাজ কেবল ইবাদত নয়, বরং নিজের কর্মের আত্মসমালোচনাও। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেন, আমার জীবনের আসল লক্ষ্য কী? আমি কি সেই লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছি? আমার আমল কি রবের সন্তুষ্টির জন্য যথেষ্ট হচ্ছে? লেখক ও গবেষক: রায়হান আল ইমরান।
সাহারা মরুভূমিতে এক ভয়াবহ যাত্রা: ট্রাক বিকল, তৃষ্ণায় প্রাণ গেল প্রায় ৫০ জন