Published : 25 Apr 2026, 07:09 PM
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যপূর্ণ আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলায় টানা তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হলেন মো. শরীফ, যিনি ‘বাঘা’ শরীফ নামেই সুপরিচিত। আজ শনিবার বিকেলে লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে তিনি পরাস্ত করেন তাঁর দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী মো. রাশেদকে। উত্তেজনাপূর্ণ এই লড়াইয়ে কৌশল ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন শরীফ। দুপুরের পর থেকেই লালদীঘির আশেপাশে উৎসুক জনতার ভিড় বাড়তে থাকে। বৈশাখের প্রখর তাপ উপেক্ষা করে সবাই খেলা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। কেউ গামছা বেঁধে, কেউ ছাতা মাথায়, আবার কেউ গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন খেলার শুরু হওয়ার। সময়ের সাথে সাথে এই ভিড় কয়েক কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে পরে। মাঠের ভেতরে ও বাইরে এক উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়। বিকেল তিনটার দিকে বাঁশির সুরে বলীখেলা শুরু হয়। ঢোলের বাদ্যে একে একে বলীরা রিংয়ে প্রবেশ করতেই চারপাশ প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে। এই বছর মোট ১০৮ জন বলী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণ—সবাই এক মঞ্চে একত্রিত হন। প্রথম রাউন্ড পেরিয়ে আটজন বলী কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তীর্ণ হন। লটারির মাধ্যমে প্রতিপক্ষ নির্ধারণের পর শুরু হয় আরও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
সেখান থেকে চারজন সেমিফাইনালে নিজেদের জায়গা করে নেন। প্রথম সেমিফাইনালে মিঠু বলীকে মাত্র দেড় মিনিটে হারিয়ে রাশেদ বলী ফাইনালে প্রবেশ করেন। অন্য সেমিফাইনালে গতবারের চ্যাম্পিয়ন শাহজালাল বলীকে পরাজিত করে বাঘা শরীফ ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেন। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী লড়াইয়ে দীর্ঘ ১৭ মিনিটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর মিঠু বলী জয়লাভ করেন। ফাইনালে আবারও গতবারের চ্যাম্পিয়ন বাঘা শরীফ ও রানারআপ রাশেদ বলীর মধ্যে মুখোমুখি হয়। শুরু থেকেই লড়াই ছিল সমান তালে। কখনো শরীফ এগিয়ে যাচ্ছিলেন, আবার রাশেদ দ্রুত সামলে নিচ্ছিলেন। হাতের কৌশল, শরীরের ভারসাম্য—সবকিছু মিলিয়ে চলছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। দর্শকেরা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলেন রিংয়ের দিকে। চারপাশে তখন শুধু চিৎকার ও ঢোলের শব্দ। ২৫ মিনিট ধরে চলে এই লড়াই। খেলার শেষ মুহূর্তে এসে মোড় ঘুরে যায়। হঠাৎ কৌশল পরিবর্তন করে শরীফ সামনে এগিয়ে যান এবং রাশেদকে ভারসাম্য হারাতে বাধ্য করেন। সেই সুযোগে তিনি রাশেদকে মাটিতে ফেলে দেন।
রেফারির বাঁশি বাজতেই বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়—‘বাঘা’ শরীফ। ঘোষণার সাথে সাথেই লালদীঘি মাঠ করতালি ও উল্লাসে ফেটে পরে। কেউ চিৎকার করে ওঠেন, কেউ হাত তুলে অভিনন্দন জানান। টানা তৃতীয়বার শিরোপা জিতে শরীফ নিজের আধিপত্য আরও সুদৃঢ় করেন। এর আগে খেলার উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। ১৯০৯ সালে বদরপাতির ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগরের উদ্যোগে এই বলীখেলার সূচনা হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় তরুণদের মধ্যে শক্তি ও সাহস জাগিয়ে তোলার উদ্দেশ্যেই এই আয়োজন শুরু হয়েছিল। ধীরে ধীরে এটি চট্টগ্রামের মানুষের অন্যতম বৃহৎ উৎসবে পরিণত হয়। প্রতি বছর ১২ বৈশাখ লালদীঘি মাঠে এই বলীখেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই খেলার সাথে জড়িত বিভিন্ন স্টল ও দোকানপাট কয়েক কিলোমিটার জুড়ে বৈশাখী মেলা তৈরি করে। কেনাবেচা, গল্প ও মানুষের ভিড়ে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। শতবর্ষ পেরিয়েও এই বলীখেলা চট্টগ্রামের মানুষের হৃদয়ে আজও এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। আর সেই মাটিতে আবারও নিজের সক্ষমতার প্রমাণ রেখে গেলেন বাঘা শরীফ।।
হামে আক্রান্ত হয়ে গেল আরও ১১ প্রাণ: শিশুদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ