Published : 31 Jan 2026, 09:08 AM
দেশের জলসীমায় মাছ ধরতে গিয়ে বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে চার শতাধিক নাগরিকের অপহৃত হওয়ার ঘটনা শুধু উদ্বেগের বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের জন্য চরম অসম্মানজনক। টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিনের প্রায় ৪২০ জন জেলে মিয়ানমারের আরাকান আর্মির হাতে পাঁচ মাস ধরে বন্দী রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীরবতা হতাশাজনক। তাঁদের উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব এবং অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘দ্বীপের নারীরা: সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জন্য একটি পরিবেশগত নারীবাদের দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ভুক্তভোগী জেলে পরিবারগুলোর আর্তনাদ এক কঠিন বাস্তবতার প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সেন্টার ফর ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স নামের একটি সংগঠন এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। নিখোঁজ জেলেদের পরিবারগুলো জানে না তাদের স্বজনেরা জীবিত আছেন, নাকি মৃত। অভাব, দারিদ্র্য ও ঋণের বোঝা স্বজন হারানোর অনিশ্চয়তার চেয়েও ভারী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমনকি এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে এক পরিবারের দুই সন্তান অপহরণের শিকার হয়েছে। দুই জেলের মা মদিনা বেগম জানান, তিনি কৈশোরে স্বামীকে হারিয়েছেন এবং অনেক কষ্টে দুই ছেলেকে বড় করেছেন। আজ তাঁরা আরাকান আর্মির হাতে বন্দী। তিনি সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন, তাঁর মৃত্যুর আগে যেন তিনি দুই ছেলেকে একবার দেখতে পারেন। ভুক্তভোগী পরিবারের এই আকুতি কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। প্রশ্ন হলো, নিজ দেশের সীমানায় জীবন-জীবিকার সন্ধানে গিয়ে নাগরিকেরা যদি বিদেশি প্যারা মিলিটারি বাহিনীর হাতে নিগৃহীত হন, তবে সেই জলসীমা রক্ষার দায়িত্ব কার? দুঃখজনকভাবে, সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকাণ্ড বা অপহরণের ঘটনায় যতটা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদ দেখা যায়, আরাকান আর্মির হাতে কয়েকশ জেলে অপহৃত হওয়ার ঘটনায় তেমন কোনো উচ্চবাচ্য নেই। সাগরে এই নিরাপত্তাহীনতাকে কেন হালকাভাবে দেখা হচ্ছে, বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে? যখন একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী একটি স্বাধীন দেশের জলসীমায় ঢুকে নাগরিকদের তুলে নিয়ে যায় এবং দীর্ঘ পাঁচ মাসেও রাষ্ট্র তাঁদের উদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো সমাধান করতে পারে না, তখন রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্র বিজয় হলেও আমাদের জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি।
সেন্ট মার্টিনের মানুষের কাছে পর্যটন কেবল দুই মাসের বিষয়, কিন্তু তাঁদের সারা বছরের জীবিকা হলো মৎস্য শিকার। যদি এই মূল পেশায় বিদেশি শক্তির আঘাত আসে এবং রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই জনপদের মানুষেরা ধীরে ধীরে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করতে পারে। আমরা মনে করি, আরাকান আর্মির সঙ্গে সরকারের কী ধরনের রাজনৈতিক বা কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, তা সাধারণ মানুষের জানার বিষয় নয়। রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো তার নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অবিলম্বে মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা করে অপহৃত ৪২০ জন জেলেকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর টহল জোরদার করে সেন্ট মার্টিন ও টেকনাফ-সংলগ্ন সাগরে বাংলাদেশি জেলেদের জন্য নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দিতে না পারলে কোনো ভূরাজনৈতিক কৌশলই সফল বলে গণ্য হবে না।।