Published : 29 Mar 2026, 05:08 AM
রমজান মাস শেষ হওয়ার সাথে সাথেই অনেকের জীবনে এক গভীর পরিবর্তন দেখা যায়। রমজানে যে মসজিদগুলো উপচে পড়া ভিড়ে ভরে থাকত, ঈদের পরদিন থেকেই যেন কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। যে ব্যক্তি পুরো মাস ধরে মিথ্যা বলা, পরনিন্দা বা খারাপ কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতেন, শাওয়ালের চাঁদ দেখা মাত্রই তিনি যেন পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যান। প্রশ্ন জাগে, তবে কি আমাদের ইবাদত আর নৈতিকতা শুধু একটি মাসের জন্য সীমাবদ্ধ? আমরা কি শুধু রমজানের সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করি, নাকি সারা বছরের জন্য? সমাজের একটি বড় সমস্যা হলো ধর্মকে কিছু নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান আর সময়ের মধ্যে বেঁধে ফেলা। অনেকে মনে করেন, রমজান হলো শুদ্ধ হওয়ার সময়, আর বাকি বছর নিজের ইচ্ছামতো চলার সুযোগ। এই ধারণাটি ইসলামি দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত। একটি বড় অংশ মাত্র ৩০ দিনের জন্য নিজেদের নফস বা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার পরে আবার পরাজিত হয়, তখন সেই জাতির পক্ষে বড় কোনো সাফল্য অর্জন করা কঠিন। আরও পড়ুনরমজান শেষ, আমলও কি শেষ১৯ ঘণ্টা আগে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, সাপ্তাহিক জুমআ এবং বার্ষিক হজ্বের মাধ্যমে মানুষকে সারাবছর একটি আধ্যাত্মিক পথে চালিত করে।
রমজান ছিল এই পথের একটি নিবিড় প্রশিক্ষণ। আলেমরা বর্তমান সময়ের এই অদ্ভুত অবস্থাকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথম দল হলো ‘রমজানি’—যারা শুধু রমজানে ধার্মিক হয়, আর মাস শেষ হলে ধর্মকে ভুলে যায়। দ্বিতীয় দল হলো ‘রব্বানি’—যারা সবসময় আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলে।বিখ্যাত আলেম শেখ মুহাম্মদ সালেম ইবনে আবদুল ওয়াদুদ (রহ.) একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, শয়তানদের কখন মুক্তি দেওয়া হয়? তিনি দুঃখের সাথে বলেছিলেন, ‘ঈদের নামাজের পরপরই, কারণ এরপরই মানুষের আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায় এবং মসজিদগুলো জনশূন্য হয়ে যায়।’ আরও পড়ুনরমজানে শেষ নয় রোজা২৮ মার্চ ২০২৫ যদি রমজানের পরে আমাদের আচরণে কোনো পরিবর্তন না আসে, তবে বুঝতে হবে আমাদের রোজা ছিল শুধু উপবাস, যা আমাদের আত্মিক পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। জাতির এই দ্বৈত নীতি আমাদের উন্নতির পথে বড় বাধা। যখন একটি বড় অংশ মাত্র ৩০ দিনের জন্য নিজেদের নফসকে জয় করে আবার পরাজিত হয়, তখন সেই জাতির পক্ষে বড় কোনো বিজয় অর্জন করা কঠিন।
ইতিহাসের সোনালী যুগের মুসলিমরা ‘রমজানি’ ছিলেন না, তারা ছিলেন ‘রব্বানি’। তাদের ইবাদত ও নৈতিকতা কোনো ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, তাই তারা বিশ্ব জয় করতে পেরেছিলেন। রমজান আমাদের যে উন্নত চরিত্র ও সহনশীলতার শিক্ষা দিয়েছে, তা ঈদের দিনেই বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। রমজানের পবিত্রতা ধরে রাখা মানেই হলো পরবর্তী ১১ মাস সেই শিক্ষার প্রতিফলন ঘটানো।যদি রমজানের পর আমাদের আচরণে কোনো পরিবর্তন না আসে, তবে বুঝতে হবে আমাদের রোজা ছিল শুধু উপবাস, যা আমাদের আত্মিক পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি।রমজান আমাদের জন্য একটি শুরু হওয়া উচিত, শেষ নয়। প্রকৃত সফল সেই ব্যক্তি, যার রমজান পরবর্তী জীবন রমজানের চেয়েও সুন্দর ও মার্জিত হয়। আরও পড়ুনশুধু রমজান নয়, মৃত্যু পর্যন্ত ইবাদত২৬ মার্চ ২০২৫।