Published : 03 Apr 2026, 09:09 AM
নদীর স্রোত বয়ে চলে, আর তার সাথে বয়ে চলে বাবুল হোসেনের জীবন। এক ঘাট থেকে অন্য ঘাট, এক লঞ্চ থেকে অন্য লঞ্চ—নৌপথই তার ঠিকানা, এখানেই তার জীবিকা। প্রায় চার দশক ধরে বাবুল হোসেন (৫৫) লঞ্চে ও ঘাটে ঘুরে ঘুরে যাত্রীদের জুতা সেলাই করেন। জুতায় কালি লাগানো ও ছেঁড়া জুতা জোড়া লাগানোর কাজেও তিনি দক্ষ। সময়ের সাথে সাথে তার শরীরে ক্লান্তি বেড়েছে, কিন্তু জীবন সংগ্রামের লড়াইটা তিনি থামিয়ে দেননি। বরিশাল নদীবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছিল এমভি সুন্দরবন-১৬ নামের একটি লঞ্চ। যাত্রীদের ভিড়ে লঞ্চের নিচতলায় দেখা মেলে বাবুলের। বাবুলের কোনো নির্দিষ্ট দোকানপাট নেই। লঞ্চের ডেকই তার কর্মক্ষেত্র। কখনো এক প্রান্তে, কখনো অন্য প্রান্তে—একটি ছোট বাক্স হাতে নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়ান। কেউ তাকে ডাকেন, ‘চাচা, জুতাটা একটু দেখে দেবেন?’ কেউ বলেন, ‘কাকা, জুতাটা একটু পালিশ করে দাও তো’—বাবুল একগাল হেসে তাঁদের কাছে যান এবং ক্লান্তি ভুলে কাজে মন দেন। বাবুলের সাথে কথা বলে জানা যায়, তার গ্রামের বাড়ি বরগুনা সদরের এম বালিয়াতলী ইউনিয়নে। যখন তার বয়স মাত্র পাঁচ বছর, তখন তার মা মারা যান।
বাবার সামান্য জমি ছিল, কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে বাবুল অনাদর-অবহেলায় বড় হতে থাকে। ১০-১২ বছর বয়সে সে বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং বরগুনা-বরিশালগামী লঞ্চে জুতা মেরামতের কাজ শুরু করে। চল্লিশ বছর পেরোনোর পর বাবুল এখন বরিশাল-ঢাকাগামী লঞ্চে স্থায়ীভাবে কাজ করছেন। বরগুনার গ্রামের বাড়িতে বাবুলের স্ত্রী ও দুই ছেলে তিন মেয়ে নিয়ে সংসার। অনেক কষ্টে তিনি মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে বাসের চালক এবং ছোট ছেলে মাদ্রাসায় পড়ছে। ছোট ছেলের লেখাপড়া ও পরিবারের খরচ তিনি নিজের আয়েই চালান। এখন তার একটি ঘর আছে, তবে সেখানে তিনি খুব কমই ফেরেন। লঞ্চই যেন তার ঘরবাড়ি। দিন-রাত, ঝড়-বৃষ্টি, গরম-শীত—সবকিছুকে সঙ্গী করে তিনি জীবন-জীবিকা চালিয়ে যাচ্ছেন। লঞ্চ ঘাটে ভিড়লে তিনি স্টাফদের কেবিনে মালামাল রেখে ডেকেই শুয়ে একবেলা ঘুমিয়ে নেন। মাথার নিচে কখনো নিজের হাত, কখনো ছোট্ট বাক্সটি বালিশ হিসেবে ব্যবহার করেন। কোনো দিন বাবুলের আয় ৭০০ টাকা পর্যন্ত হয়, আবার কোনো দিন ২০০-৩০০ টাকাও ওঠে না।
এমন অনেক দিন গেছে, যখন সারা দিন কাজ করার পরও তার খরচ ওঠেনি। তবে তার থেমে থাকার কোনো সুযোগ নেই, কারণ তিনি থামলেই তার ঘরে চুলা হয়তো জ্বলবে না। বাবুল জানান, কোনো দিন আয় না হলে তিনি নতুন কাজের খোঁজে ভোরবেলায় বরিশাল লঞ্চঘাট থেকে ভোলার লঞ্চে ওঠেন এবং সন্ধ্যায় আবার ঢাকার লঞ্চে ফিরে আসেন। বড় কোনো স্বপ্ন তার ফুরসত পায়নি। তার জীবনে শুধু একটি অনিবার্য দায়—পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া, সন্তানদের টিকিয়ে রাখা এবং নিজের অস্তিত্বটুকু সম্মানের সাথে ধরে রাখা। কথা বলার সময় লঞ্চ ছাড়ার সময় ঘনিয়ে আসে। কীর্তনখোলার ঘোলা পানিতে দখিনা বাতাস দোলা দেয়, তীরে এসে আছড়ে পড়ে ছোট ছোট ঢেউ। হুইসেলের তীক্ষ্ণ অথচ গগনবিদারী শব্দে চারপাশ ডুবে যায়। সেই শব্দে মিলিয়ে যেতে থাকে বাবুলের কণ্ঠও। শেষ প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়ে লঞ্চ থেকে নেমে আসেন এই প্রতিবেদক, ‘কবে বাড়ি ফিরবেন?’ ঠোঁটের কোণে আক্ষেপের হাসি ছড়িয়ে বাবুল বলেন, ‘ভাইস্যা থাহা মাইনষের কোনো ফিরনের তাগিদ থাহে না।...পথই হ্যাগো ঘর!’।
মেঘনার কালবৈশাখী: বাবা ও ছেলের লাশসহ ৩ জেলের দাফনকার্য সম্পন্ন