Published : 11 Jun 2026, 08:24 PM
জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রতিকূল সময়ে দেশের এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো বজ্রপাত। বিশেষত চৈত্র-বৈশাখ ও বর্ষার সময় খোলা মাঠে কাজ করার সময় অসংখ্য কৃষক প্রাণ হারাচ্ছেন এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শুধু গাইবান্ধা জেলাতেই গত এক বছরে বজ্রপাতে তেরো জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং বহু আহত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রামে কৃষকদের জন্য একটি আশ্রয়স্থল বা ছাউনি তৈরি হওয়ার আশার আলো দেখা যায়। কিন্তু এই ধরনের প্রয়োজনীয় স্থাপনা অন্যান্য বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে যে চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত হতাশাজনক। জানা গেছে, ২০২০ সালে এক কৃষি কর্মকর্তার দূরদর্শিতা ও উদ্যোগে শিবরাম গ্রামের ফাঁকা মাঠে মাত্র তিরাশি হাজার টাকায় একটি গোলঘর বা ‘কৃষক ছাউনি’ নির্মাণ করা হয়।
এর মূল লক্ষ্য ছিল—মাঠে কাজ করার সময় আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টি বা বজ্রপাতের সময় কৃষকরা দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেন। বিগত ছয় বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, এই সামান্য ছাউনির কারণে ওই নির্দিষ্ট এলাকায় বজ্রপাতে আর একটি প্রাণও হারায়নি। বর্তমানে কৃষকরা মেঘের ডাক শুনলে দিগ্বিদিক না ছুটে এই ছাউনিতে আশ্রয় নিচ্ছেন এবং প্রখর রোদে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, একটি সফল পরীক্ষামূলক (পাইলট) প্রকল্পের পরেও গত ছয় বছরে জেলাজুড়ে এই ছাউনির সংখ্যা আর একটিও বৃদ্ধি পায়নি। প্রশ্ন হলো, যা সরাসরি কৃষকের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে, তা কেন আটকে থাকবে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবরই ‘বরাদ্দের অভাব’ বা অন্যান্য অজুহাত দেখিয়েছে। এমনকি স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্যের ৫০টি ছাউনি নির্মাণের বড় প্রতিশ্রুতিও আর্থিক সংকটের অজুহাতে বাস্তবায়িত হয়নি।
যেখানে দেশে কোটি কোটি টাকার মেগা প্রকল্প চলছে, সেখানে মাত্র পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকার একটি জনকল্যাণমুখী ও জীবন রক্ষাকারী উদ্যোগ অর্থের অভাবে থমকে থাকা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। বজ্রপাতকে ইতিমধ্যেই জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু শুধু দুর্যোগ ঘোষণা বা তালগাছ রোপণের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে তো প্রতিদিন মাঠে কৃষকের জীবন বিপন্ন হবে। তালগাছ বড় হতে যে সময় লাগে, তার চেয়ে কৃষক ছাউনির মতো তাৎক্ষণিক ও সাশ্রয়ী সমাধান কেন সারা দেশের হাওর, চর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের ফসলি মাঠগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না? আমরা মনে করি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বরাদ্দের অজুহাত বন্ধ করে কৃষি বিভাগ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে দেশব্যাপী কৃষক ছাউনি নির্মাণের একটি সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত।।