Published : 13 Oct 2025, 05:08 PM
বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের যে আশার আলো দেখা গিয়েছিল, তা এখনো পর্যন্ত একটি স্থায়ী রাজনৈতিক রূপ লাভ করেনি। ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে – অন্তর্বর্তী সরকার তা ঘোষণা করেছে। কিন্তু শুধু তারিখ ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হলো, এই নির্বাচন কি সত্যিই গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে?রাজনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। এক সময়ের প্রভাবশালী আওয়ামিলীগ জাতীয় নিরাপত্তা আইনের বেড়াজালে কার্যক্রম স্থগিত দেখতে পাচ্ছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী আদালতের রায় পেয়ে আবার রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে এসেছে। এই পরিবর্তনগুলো আমাদের পুরনো অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয় – এক দলের পতন অন্য দলের জন্য সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে খুব বেশি পরিবর্তন আসে না। এই পরিস্থিতিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশগ্রহণের কথা জানিয়েছেন। প্রায় দুই দশক ধরে লন্ডনে বসবাস করা এই রাজনীতিবিদ সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অনেকেই আগ্রহ নিয়ে দেখছেন, তবে সন্দেহও রয়েছে – বিএনপি কি সত্যিই অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পেরেছে?তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে তার নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যেমন একটি পরীক্ষার মুখোমুখি, তেমনি অন্তর্বর্তী সরকারের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের মুহূর্ত।
সরকার যদি আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, তবে আইন যেন কারো জন্য আশ্রয়স্থল বা কারো জন্য অস্ত্র না হয়। সকলের জন্য সমান আচরণই হবে এই নির্বাচনপূর্ব সময়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।একটি নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ওপর, কেবল প্রচারণার ওপর নয়। সময়সূচির সুস্পষ্ট ঘোষণা, মনোনয়ন প্রক্রিয়ার পরিষ্কার নির্দেশনা এবং সকল দলের জন্য সমান সুযোগ – এই তিনটি শর্ত পূরণ হলেই জনগণ ভোটকেন্দ্রে আস্থা নিয়ে যেতে পারবে। সামান্য বিলম্ব, অস্পষ্টতা অথবা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ সেই আস্থা নষ্ট করে দিতে পারে।তবে নিয়মকানুনই সবকিছু নয়। বাংলাদেশের জনগণ চায় আদালত, পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশন যেন রাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করে, কোনো বিশেষ দলের পক্ষে নয়। বৈধতার ঘোষণা যথেষ্ট নয়, মানুষ তা অনুভব করতে চায়। ভোটকেন্দ্রে ভয়, পক্ষপাতিত্ব বা অনিয়ম দেখলে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেও সেই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়।২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন এই সমাজে নতুন এক চেতনা জাগিয়েছিল। তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিতে নৈতিকতার প্রশ্নটি তুলে ধরেছিল।
তারা কোনো নতুন নেতা খুঁজেনি, তারা চেয়েছিল ন্যায্যতা ও মর্যাদা। এখন প্রশ্ন হলো, সেই শক্তি কি টিকে থাকবে, নাকি পুরনো ক্ষমতার সংস্কৃতি সবকিছু গ্রাস করবে?অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হলো এমন একটি নির্বাচন নিশ্চিত করা, যা নিয়ে কারো মনে কোনো সন্দেহ থাকবে না। আর বিরোধী দলের দায়িত্ব হলো নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রতিশোধ না নিয়ে, সংস্কারের রাজনীতি দেখানো। উভয় পক্ষই যদি নিজেদের সীমা ছাড়িয়ে একটু উদার হয়, তাহলে এই নির্বাচন সত্যিকারের নতুন সূচনা হতে পারে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি নির্বাচনের অপেক্ষায় আছে, যা সত্যিকার অর্থে জনগণের কাছে নিজেদের নির্বাচন মনে হবে। ফেব্রুয়ারী ২০২৬ সেই সুযোগ নিয়ে আসছে, কিন্তু সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এই এক বছরে আমাদের রাজনীতি যদি শৃঙ্খলা, ন্যায্যতা ও সাহস দেখাতে পারে, তাহলে এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি হবে বিশ্বাস পুনর্গঠনের এক নতুন অধ্যায়।বাংলাদেশ এখনো সেই সুযোগ হারায়নি। প্রশ্ন শুধু একটাই – আমরা কি সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারব?আরিফুর রহমান, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ আলাবামার পিএইচডি গবেষক। তাঁর গবেষণার বিষয় ‘সামাজিক আন্দোলন ও দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক রূপান্তর’।।