Published : 03 May 2026, 11:09 PM
সড়কের পাশে ধান স্তূপ করে রেখেছিলেন কৃষক রাসেল মিয়া, শরীরটা তখনও ঠান্ডায় কাঁপছে। হাওরের কইয়েরকোনা বিলের কাছে তিনি আড়াই বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। শনিবার বিকেলে জুড়ী-দাসেরবাজার সড়কের কালনীগড় এলাকায় আলাপকালে তিনি জানালেন, “পানির ভেতর থেকেই ধান কেটে আনছি। এখনো এক বিঘা জমির ধান কাটতে বাকি। বৃষ্টি থামছেই না, শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। কী আর করি, আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি।” রাসেলের সাথে কথা বলার সময় জাহাঙ্গীর আলম নামের এক বর্গাচাষি জোর করে তাকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সেখানে কয়েকটি বস্তায় ভরা ধান দেখিয়ে তিনি বললেন, “দেখুন, ধানে চারা গজিয়ে গেছে! গত কয়েকদিন রোদ নেই, তাই ধান শুকানোর উপায়ও নেই। প্রথমে পানিতে ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম, তার ওপর এই টানা বৃষ্টি!” তিনি জানান, হাওরে তার পাঁচ বিঘা জমির মধ্যে মাত্র দুই বিঘা থেকে ধান তুলতে পেরেছেন, বাকিটা এখনো পানির নিচে। মৌলভীবাজারের জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলার হাওরপাড়ের কৃষকদের অবস্থাও প্রায় একই রকম।
তাদের ভাষ্য, কয়েক দফা ভারী বৃষ্টি আর পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে হাওর ও নিচু জমির ফসল তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে কিছু কৃষক কম্বাইন হারভেস্টার ও শ্রমিক দিয়ে ধান কেটেছিলেন, কিন্তু পরে বৃষ্টির কারণে যন্ত্র দিয়ে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকে বজ্রপাতের ভয়ে শ্রমিকও পাঠাতে চাননি, ফলে শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে কৃষকরা পরিবারের সদস্যদের সাহায্য নিয়ে ফসল রক্ষার চেষ্টা করছেন। জুড়ীর কালনীগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রের নিচে খাকটেকা গ্রামের বর্গাচাষি বাবুলাল দাস ধান ছড়িয়ে রেখেছেন। তিনি জানান, ১০ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন এবং বিঘাপ্রতি ১২ থেকে ১৪ মণ ধান পেয়েছেন। তবে বৃষ্টির কারণে বাড়ির উঠান ও রাস্তা ভিজে থাকায় ধান শুকানো যাচ্ছে না। তাই বাতাসে একটু হলেও শুকানোর জন্য এখানে ছড়িয়ে দিয়েছেন। বেলাগাঁও, সোনাপুর ও দেবের বন এলাকায় ৪০ থেকে ৫০ জন শ্রমিক পানির নিচ থেকে ধান কেটে নৌকায় তুলছিলেন। কেউ কেউ আগে থেকেই ধান কেটে আঁটি বেঁধে পানিতে ভাসিয়ে রেখেছিলেন, সেগুলোও নৌকায় তোলা হচ্ছিল।
বেলাগাঁও গ্রামের নূরুল ইসলাম বললেন, “এবছর ভালো ফসল হয়েছিল, কিন্তু কৃষকরা ফসল তোলার সময় পাননি। এত টানা বৃষ্টি হবে, তা কেউ ভাবেনি।” রোববার সকালে জুড়ী উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম খান জানান, উপজেলায় ৬ হাজার ১৭০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল, যার মধ্যে হাকালুকি হাওরের কিছু এলাকার ফসল ডুবে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা করার জন্য ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে ২ হাজার ২৫০ জন কৃষককে সহায়তা দেওয়া হবে, সেই তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তবে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কুলাউড়ায় এবার ৮ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৩৮০ হেক্টরের ধান তলিয়ে গেছে বলে জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৮০০ জন কৃষককে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে, সেই তালিকাও তৈরি করা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ মুঠোফোনে জানান, বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় হাওর এলাকায় পানি বাড়ছে।।
লেবুবাগানে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: বিদ্যুতের ফাঁদে প্রাণ হারালেন দিনমজুর