Published : 04 Aug 2026, 09:16 AM
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর মোহনায় দাঁড়িয়ে প্রকৃতির এক করুণ চিত্র চোখে পড়ে—প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন এবং মাছ ধরার জালের টুকরো দিয়ে ভরা এক বিষাদময় দৃশ্য। কিন্তু এই দৃশ্য কেবল পরিবেশগত নয়; এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক মারাত্মক জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার সংকট। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, এই প্লাস্টিক ভেঙে তৈরি হওয়া অতি ক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন শুধু কর্ণফুলীর জল বা তলদেশে নয়, হালদা নদীর মাছের শরীরেও প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ, দূষণ এখন নদীর সীমানা পেরিয়ে সরাসরি মানুষের খাদ্যচক্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এটি কেবল পরিবেশের ক্ষতি নয়, বরং মানবজাতির জন্য এক গুরুতর সতর্কবার্তা। কর্ণফুলী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, অসংখ্য শিল্প এবং লাখো মানুষের জীবিকা এই নদীর ওপর নির্ভরশীল।
অথচ আজ এই গুরুত্বপূর্ণ নদী পরিণত হয়েছে নগরের বর্জ্যের অন্তিম গন্তব্যে। গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর জল ও পলিতে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হয়েছে। দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি যেখানে শিল্পাঞ্চল, বন্দর এবং নগরজীবনের প্রভাব সর্বাধিক—নদীর নিম্নপ্রবাহে। আরও উদ্বেগজনক হলো, একই ধরনের দূষণ বিশ্বের একমাত্র প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটানির্ভর কার্পজাতীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীতেও ছড়িয়ে পড়েছে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, প্রতিটি মাছের শরীরে এই কণা পাওয়া গেছে, যা কেবল পরিপাকতন্ত্রেই নয়, মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত মাছের পেশিতেও শনাক্ত হয়েছে। এর অর্থ হলো, প্লাস্টিক দূষণ এখন সরাসরি আমাদের খাবারের অংশ হয়ে ওঠার বাস্তব ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে এই দূষণের উৎস হলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পকারখানার বর্জ্য, অপরিশোধিত নর্দমার জল এবং প্লাস্টিকজাত পণ্যের লাগামহীন ব্যবহার।
কর্ণফুলীর ক্ষেত্রে নগর জীবনের বর্জ্য নদীতে মিশে যাচ্ছে, আর হালদার ক্ষেত্রে শাখা খাল ও গৃহস্থালি বর্জ্য একই বিপদ সৃষ্টি করছে; এটি একটি অববাহিকাভিত্তিক সমস্যা, যার সমাধানও হতে হবে সমন্বিতভাবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরীয়ার মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক কেবল দূষক নয়, তারা ভারী ধাতু ও বিষাক্ত রাসায়নিক বহন করে জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশ করতে পারে। অন্যদিকে, অধ্যাপক ইদ্রিস আলীর মতে, যখন এই দূষণ মৎস্যসম্পদ এবং খাদ্যনিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে, তখন তা জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। এই অদৃশ্য সংকটকে উপেক্ষা করা চলে না। শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) কার্যকরভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে এবং সেগুলোকে এমন প্রযুক্তিতে উন্নীত করতে হবে, যাতে মাইক্রোপ্লাস্টিক আটকে রাখা সম্ভব হয়। নদী থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে কঠোর আইন প্রয়োগ, নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং নিয়মিত পরিবেশগত নজরদারি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।।